শিক্ষার কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই যে বিষয়টা আমাদের সামনে চলে আসে সেটি হলো শিক্ষা কি? এই প্রশ্নের উত্তর দাশনিক, মনিষীরা ভিন্ন ভিন্ন মত পোষন করলেও তাঁরা একটি বিষয়ে একমত হয়েছেন সেটি হলো-প্রকৃতির প্রতিকুল পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করে টিকে থাকতে গিয়ে মানুষ যে জ্ঞান অর্জন করেছে তার সংকলিত রুপকেই মূলত শিক্ষা বলে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই পৃথিবীতে মানুষের টিকে থাকা এবং প্রগতির পথকে প্রশস্ত করবার একমাত্র হাতিয়ার হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষায় মানুষকে নীতি-নৈতিকতা শেখায়, ভালো-মন্দের বিচার করতে শেখায়, অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে শেখায়, প্রতিকুল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে শেখায়। অর্থাৎ যে জাতি যত বেশি মানুষকে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারে সে জাতি ততবেশি উন্নতির চরম শিখরে পৌছাতে পারে।
আরিস্টটল বলছেন-“অশিক্ষিত মানুষ অপেক্ষা শিক্ষিত মানুষ ঠিক ততোটায় উৎকর্ষের অধিকারী যতটা জড় অপেক্ষা জীব”। অর্থাৎ শিক্ষা মানুষকে নিশ্চল প্রাণি থেকে সচল প্রাণিতে পরিনত করে। রুশো বলছেন-“জন্মকালীন ত্রুটিপূর্ন মনুষত্ব লাভে যা-কিছু প্রয়োজন সেই সবই পূরণ করে শিক্ষা”।
রবিন্দ্রনাথ বলছেন-“ জীবনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের আশ্রয়স্থলটি গড়িয়া তোলাই রীতিমতো শিক্ষা”। ফলে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য মানুষ হওয়া। যদিও অনেক মনীষী এই বিষয়ে দ্বিমত পোষন করেন। দুই হাজার বছরের অধিক সময় ধরে এই বিতর্ক চলমান আছে। শিক্ষার আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিতর্ক প্রথম শুরু হয়েছিল প্রাচীন গ্রীসে।
এখানে মূলত আমরা তিনটি মতবাদ দেখতে পাই-
- এক ঘরনার দার্শনিকগণ মনে করতেন, শিক্ষা অর্থ উপাজনের হাতিয়ার নয়, শিক্ষার লক্ষ্য হলো জ্ঞান অর্জন করা। এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন সক্রেটিস তিনি বিশ্বাস করতেন অর্থের বিনিময়ে বিদ্যা বিক্রি করা পাপ। তিনি বলছেন-“হে এন্টিফন, আমাদের মধ্য অনেকে বিশ্বাস করে যে জ্ঞান ও সৌন্দর্য সম্মানজনক বা অসম্মানজনক ভাবে বিতরণ করা যায়। কোন ব্যক্তি যদি দৈহিক সৌন্দর্য ক্রয় করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে তাকে দেহ ব্যবসায়ী বলে। একইভাবে যাঁরা তাঁদের জ্ঞান অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে তাঁদের লোকেরা সফিস্ট বলে। তারা হচ্ছেন জ্ঞান জগতের দেহ ব্যবসায়ী”।
- এই ঘটনার প্রধান হলেন প্রোটাগোরাস তিনি বলছেন- “ বিদ্যার মূল লক্ষ্য হল বাস্তব জীবনে সাফল্যের জন্য শিক্ষাথীদের গড়ে তোলা। যেহেতেু এই শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষাথীরা অর্থ উপার্জন করতে পারে ফলে এই শিক্ষা উনি চড়া দামে বিক্রি করতেন! ঐ সময়ে তিনি ছাত্র প্রতি ১০ হাজার দ্রাগমা গ্রহণ করতেন। এই সময়ে হলে যার মূল্য দাঁড়াই প্রায় ৩০ হাজার ডলার এবং এই টাকা নেওয়াকে তিনি অন্যায় মনে করতেন না।
- এই মতবাদের প্রবক্তা ছিলেন এরিস্টিপাস। তিনি উপরোক্ত মতবাদের কোনটায় গ্রহন করেননি বরং তিনি বলতেন- “বিদ্যার উদ্দেশ্য দারিদ্রও নয় আবার ঐশ্বর্যও নয়। বিদ্যা শিক্ষা করে শিক্ষার্থীদের ঐশ্বর্যের দাস হলে চলবে না, বরং ঐশ্বর্যের প্রভু হতে হবে”। তিনি শিক্ষা প্রদানের জন্য টাকা নেওয়াকে খারাপভাবে দেখতেন না, তবে তিনি শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে সীমিত টাকা নেওয়াকে নায্য মনে করতেন। প্রাচীনকালের ধ্যান-ধারনা এখন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। গত দুই শতকে শিক্ষায় কারিগরি পরিবর্তনের ফলে জ্ঞানের জগতে বিশাল এক বিস্ফোরন ঘটে গেছে। ফলে দুটি বিষয় আমাদের সামনে এসে হাজির হয়েছে। নৈপূন্য শিক্ষা/কারিগরি শিক্ষা এবং জ্ঞান শিক্ষা। কারিগরি শিক্ষাও কিন্তু জ্ঞান শিক্ষার মতো অর্জন করতে হয়। এই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- ভিন্ন-ভিন্ন পেশার চাহিদা অনুসারে কারিগরি দক্ষতা অর্জন করা। অপর দিকে জ্ঞান শিক্ষার মূলে জড়িয়ে আছে মূল্যবোধ, জীবন আদেশের প্রশ্নগুলি। খেয়াল করলে দেখবেন নৈপূণ্য/কারিগরি শিক্ষায় মূল্যবোধের বালাই নাই। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে নৈপূণ্য/কারিগরি শিক্ষা প্রধান হয়ে পড়লো আর জ্ঞান শিক্ষা অ-প্রধান হয়ে পড়লো। শিক্ষা এখন নির্ধারিত হচ্ছে বাজারের চাহিদা এবং সরবরাহের ভিত্তিতে। ফলে বর্তমানে শিক্ষা একটি বিনিয়োগকারি পন্যে পরিনত হয়েছে। পুঁজির ধর্মই হচ্ছে যেখানে মুনাফা বেশি সেখানে বিনিয়োগ। ফলে দেখবেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাজারের চাহিদার উপর ভিত্তি করে সাবজেক্ট নির্ধারন হয়। ঠিক এই কারণেই সমাজে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও নীতি-নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ সম্পর্ন মানুষের সংখ্যা কমছে।
একটি দেশের মানুষের আচার-আচরন, নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি কেমন হবে সেটা পুরোপুরি নির্ভর করে তারা কোন ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। শতকের পর শতক শাসকরাই নির্ধারন করেছে তারা জনগনকে কেমন শিক্ষায় শিক্ষিত করবে এবং শিক্ষার অবকাঠামো, উপরিকাঠামো কি হবে। তাদের নীতি বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষানীতি প্রনয়ন করেছেন। কারন শিক্ষার সাথে মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কগুলো বিশেষভাবে জড়িত। এইটা বুঝা যায় ১৮৩৫ সালে মেকলের প্রনিত শিক্ষানীতি দেখলে।
সুপারিশে তিনি বলছেন- আমরা একদল শিক্ষিত মানুষ তৈরী করতে চাই যারা রক্তে-বর্ণে হবে ভারতীয় কিন্তু চিন্তা-চেতনায় হবে ইংরেজ, যারা মুষ্টিমেয় ইংরেজ এবং সংখ্যাগরিষ্ট ভারতবাসীর মধ্য সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করবে। ১৮৫৪ সালে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী চার্লস উডের নেতৃত্বে একটি গোছালো শিক্ষানীতি প্রনয়ন হয়। অনেকেই এটাকে ম্যাগনাকাটা হিসাবে আখ্যা দেন। কিন্ত নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে বুঝা যায় এটা মোটেও সঠিক নয়। সুপারিশে বলা হচ্ছে শিক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র নিবে না, ব্যয় বহন করতে হবে শিক্ষাথীদের! মানে দাঁড়ালো শিক্ষা কিনে নিতে হবে।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার পর পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠি ৬ টি শিক্ষানীতি প্রনয়ন করে যার একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৫১ সালে মাওলানা আকরাম খান, ১৯৫৭ সালে আতাউর রহমান খান, ১৯৫৯ সালে এসএম শরীফ কমিশন। এই শরিফ কমিশনের মূল বক্তব্য ছিল- “শিক্ষা সস্তায় পাওয়া যাইবে না………… অবৈতনিক শিক্ষা ধারনা মূলত কল্পনা মাত্র। গরীব মানুষদের কাছ থেকে শিক্ষা কেড়ে নেওয়ার যে পরিকল্পনা, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে মোস্তফা, বাবুল, ওয়াজিউল্লাহর শহিদী আত্নদানের মাধ্যমে সে চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল এদেশের ছাত্র-জনতা। ১৯৬৬ সালে হামিদুর রহমান কমিশন, ১৯৬৯ সালে নুর খান কমিশন এবং ১৯৭০ সালে শামসুল হক কমিশনের কোনটিই বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য হয়নি। ফলে প্রায় প্রত্যেকটি শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে এবং কোনটিই বাস্তবায়িত হয়নি।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম শিক্ষানীতি প্রণিত হয় ১৯৭২ সালে ড: কুদরত-এ-খুদা এর নেতৃত্বে। স্বাধীন দেশের প্রথম শিক্ষানীতিতে বেশকিছু ভালো বক্তব্য থাকলেও পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের মতোই শিক্ষা সংকোচন নীতি গ্রহন করে। জেনারেল জিয়ার আমলে কাজী জাফরের শিক্ষা কমিশন, স্বৈরাচার এরশাদ এর আমলে ড: আব্দুল মজিদ খান ১৯৮৩ সালে শিক্ষানীতি প্রনয়ন করেছেন, যার মুল বক্তব্য ছিলো- “টাকা যার, শিক্ষা তার”। এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারীর ছাত্র আন্দোলনে জয়নাল, দিপালী, কাঞ্চনসহ আরো অনেকে শহীদ হয়েছেন। তাঁদের রক্তদানের মাধ্যমে সরকার শিক্ষা সংকোচন নীতি থেকে সাময়িক সরে আসলেও এই ধারাবাহিকতা এখনো বিদ্যমান আছে। ১৯৮৮ সালে মফিজ উদ্দিন কমিশন, দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৭ সালে এম সামসুল হককে প্রধান করে কমিশন গঠন হয় এবং ২০০০ সালে স্বাধীন দেশে প্রথমবারের মতো শিক্ষানীতি সংসদে পাশ হয়। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারনেই সেই শিক্ষানীতি বাতিল হয়। ২০০২ সালে ড.এম এ বারী এবং ২০০৩ সালে মোহাম্মদ মুনিরুজ্জামান এর নেতৃত্বে কমিশন গঠিত হলেও তা বাস্তবায়ন হয় নি। ২০১০ সালে প্রনিত শিক্ষানীতি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত শিক্ষানীতিতে পরিনত হয়েছে। এই শিক্ষানীতির সবচেয়ে সমালোচনার দিক হচ্ছে শিক্ষাকে বাজারি পন্যে পরিনত করে।
একটা দেশের শিক্ষানীতির উপর নির্ভর করে সেই দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতির বিকাশ ইত্যাদি। এই শিক্ষানীতিই নির্ধারন করে দেশের কতগুলো মানুষ শিক্ষা পাবে, কোন ধরনের শিক্ষা পাবে, শিক্ষার ব্যয় শিক্ষার্থী নাকি রাষ্ট্র বহন করবে। কতটুকু জ্ঞান শিক্ষা দেবে আর কতটুকু নৈপূণ্য/কারিগরি শিক্ষা দেবে সেটাও নিধারিত হয় শিক্ষানীতির মাধ্যমে এমনকি শিক্ষায় কতটুকু বেসরকারিকরণ হবে আর কতটুকু রাষ্ট্র দায়িত্ব নেবে সেটাও ঠিক করে শাসক শ্রেনি এই শিক্ষানীতির মাধ্যমে। স্বাধীনতার আগে ও পরে সবগুলো শাসকরাই শিক্ষার বেসরকারিকরণ ও বানিজ্যিকিকরণ সম্প্রসারন করেছে, শিক্ষার ব্যায় বৃদ্ধিতে নীতিগত অবস্থান বজায় রেখেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মুক্ত বাজার অথনীতির ধারক-বাহকরা, তারা সমস্ত পরিসেবা খাতকে পণ্যে পরিনত করতে চায়। এদের নীতি বাস্তবায়নের জন্য পৃথিবীর দেশে দেশে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, ইউএনডিপি এর মতো সংগঠনগুলো কাজ করে, এরা মূলত পুঁজিপতিদের পাহারাদার। আপনাদের মনে থাকবার কথা বাংলাদেশ ১৯৯৫ সালে- General Agreement on Trade in Services (GATS)-WTO চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির শর্ত হিসাবে সরকার ১৬১টি পরিসেবা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে পারবে না বরং এই সেবাখাত গুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তারা এর নাম দিয়েছে পিপিপি-(পাবলিক প্রাইভেট পাটনারশিপ) সহজভাবে বললে কোন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বেসরকারি কোম্পানী হল নির্মান করে ব্যবসা করতে পারবে।
উচ্চশিক্ষা বানিজ্যিকিকরণের বড় আকারে পদক্ষেপ গ্রহন করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২০০৬ সালে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে-“জাতীয় উচ্চশিক্ষা (National strategy for Higher Education 2006-2026) যাকে ২০ বছর মেয়াদী কৌশলপত্র বলা হয়। এই কৌশলপত্রের অর্থ ব্যবস্থাপনাতে বলা হয়-১.সরকারি বাজেট, ২.আন্তজাতিক সংস্থা (বিশ্বব্যাংক, এডিপি, ইউএনডিপি ইত্যাদি) এবং ৩.বেসরকারি খাত ও অ্যালামনাই ফান্ড। এরপর একের পর এক প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংক হাজির হতে থাকে যেমন- Higher Education Quality Enhancement Project (HEQEP), Secondary Education Quality and Access Enhancement Project (SEQAEP), Quality Learning for All Program (Primary Education/PEDP4) এরকম আরো ৬ টি প্রকল্প বিশ্বব্যাংক বাস্তবায়ন করছে। সবশেষ এই মাসে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং বিশ্বব্যাংকের মধ্য নতুন একটি প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। Higher Education Acceleration and Transformation Project (HIT) এই প্রকল্পটিও পিপিপি’র মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। যেখানে সরকার ৫৫ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাংক ৪৫ শতাংশ বিনিয়োগ করবে।
এই পিপিপি’র ফলাফল আপনারা দেখতে পাবেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গড়ে উঠার দিকে খেয়াল করলে। ২০০৭ সাল থেকেই ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠা শুরু করে। ৫ হাজারের অধিক এনজিও পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২৬ হাজার কিন্ডার গাডেন, শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, শতশত বেসরকারি কলেজ গড়ে উঠে। পাড়ায় পাড়ায় কোচিং সেন্টার গড়ে উঠে। এতো প্রতিষ্ঠানের জন্য যত ছাত্র প্রয়োজন ২০০৬/৭ সালে তত পাশের হার ছিলো না, ফলে সরকার কৃত্রিমভাবে পাশের হার বৃদ্ধি করতে থাকে। ২০০৬ সালে পাশের হার ছিল ৫৯ শতাংশ সেটা ২০২১ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ৯৩ শতাংশে!(এসএসসি) এতে করে শিক্ষা ব্যবসায়ীদের পকেট ভারি হলেও শিক্ষার মান তলানীতে নেমেছে বলে শিক্ষাবিদরাই দাবি করছেন। আরো মজার বিষয় হলো বাজার কেন্দ্রীক শিক্ষার প্রসার ব্যাপকতা পেলেও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা দিনকে দিন সংকুচিত হয়েছে। একথা এখন প্রায় শোনা যাচ্ছে শিক্ষিতের পরিমান বাড়ার পরও নৈতিকতা সম্পূর্ন মানুষ বাড়েনি।
গত ২৫ আগষ্ট মুন্সিগঞ্জ জেলার এক অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মহোদয় বলেছেন-“ শিক্ষা মৌলিক অধিকার কিন্তু উচ্চ শিক্ষা নয়”। শরিফ কমিশন ১৯৬২ সালে একই কথা বলেছিলেন! এদিকে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় মুঞ্জরি কমিশন এবং বিশ্বব্যাংক, এডিপি যে পিপিপি’র কথা বলছেন ঠিক একই কথা ডাকসু নিবাচনে বিজয়ী ছাত্রশিবির প্যানেল তাদের নিবাচনী ইশতেহারের ৩নং অনুচ্ছেদে বলছেন। ইতিমধ্যে আমরা দেখতে পেলাম চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে ডাকসু প্রতিনিধিরা স্বাক্ষাত করেছেন এবং বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হল নির্মানের প্রস্তাবও নাকি দেওয়া হয়েছে। যেখানে ছাত্র প্রতিনিধিদের দাবি তোলার কথা ছিলো শিক্ষার আথিক দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে, জিডিপির ৫ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ২৫ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দিতে হবে, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও সর্বোচ্চ বেতন নিশ্চিত করতে হবে। সেখানে কিনা ছাত্র প্রতিনিধিরাই শিক্ষার বেসরকারিকরণ, বানিজ্যিকীকরনের পথকে প্রশস্ত করছে! নাকি পুঁজির মালিকরা ছাত্র সংসদ প্রতিনিধিদের পোষক হিসাবে ব্যবহার করে নিজেদের ফায়দা হাসিল করছে। এই প্রশ্ন তোলা সম্ভবত অমূলক হবে না। এই প্রক্রিয়া চলমান থাকলে শিক্ষায় ধনী-গরীব বৈষম্য আরো প্রকট হবে। দেখা যাবে- টাকা যার, শিক্ষা তার! এভাবে চলতে থাকলে এক সময় পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাবে। এর বিরুদ্ধে এখনই সচেতন নাগরিক, ছাত্র-শিক্ষক-অবিভাবকদের সোচ্চার হতে হবে।


