কলেজের বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় গান গেয়ে তিনটি পুরস্কার পেয়েছিলাম। তার মধ্যে একটি ছিল মোবাশ্বের আলীর লেখা নজরুল প্রতিভা। খুব মনোযোগ দিয়ে বইটি পড়েছিলাম। নজরুল সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য জেনে তাঁকে জানার আগ্রহ আরও বেড়ে গিয়েছিল। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এর বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে গভীরভাবে জানার সুযোগ হয়েছিল। তখন পড়েছি সঞ্চিতা, অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী, দোলনচাঁপা, সাম্যবাদী, চক্রবাক, ব্যথার দান এবং নজরুল রচনাবলীর বিভিন্ন খণ্ড। প্রতিটি গ্রন্থ যেন আমাকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বিদ্রোহ প্রেম সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর সঙ্গে।
কিন্তু মাস্টার্স টিউটোরিয়াল ক্লাসে সবচেয়ে গুরুগম্ভীর শিক্ষক আলতাফ স্যার একদিন “মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি আর হাতে রণতূর্য” এই বিখ্যাত পঙক্তিটি এতো সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে নজরুলের প্রেম আর বিদ্রোহী সত্তাকে আমি যেন নতুনভাবে উপলব্ধি করেছিলাম। সেদিন অবশ্য স্যার ছিলেন খুব হাস্যোজ্জ্বল। তাঁর কণ্ঠে পঙক্তিটির ব্যাখ্যা শুনতে শুনতে মনে হয়েছিল নজরুল যেন কেবল একজন কবি নন তিনি এক বিস্ময়কর শক্তির নাম। তাঁর ভেতরে যেমন ছিল ভালোবাসার কোমলতা তেমনি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন প্রতিবাদ। সেই ক্লাসের কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে। সাহিত্য কখনো কখনো যে মানুষের জীবনদর্শন বদলে দিতে পারে সেদিন যেন সেটাই অনুভব করেছিলাম।
আসলে এই একটি পঙক্তির মধ্যেই ধরা পড়ে নজরুলের সমগ্র সৃষ্টিসত্তা। তিনি ছিলেন একাধারে প্রেমের কবি আবার বিদ্রোহেরও কবি। তাঁর এক হাতে ছিল বাঁশরি যেখানে বেজেছে প্রেম প্রকৃতি মানবতা আর সৌন্দর্যের সুর। অন্য হাতে ছিল রণতূর্য যেখানে ধ্বনিত হয়েছে শোষণ বঞ্চনা অন্যায় আর পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান। বাংলা সাহিত্যে এমন বৈপরীত্যপূর্ণ অথচ সুষম ব্যক্তিত্ব খুব কমই দেখা যায়।
নজরুলের কবিতা পড়লে মনে হয় তিনি যেন মানুষের অন্তরের ভাষা জানতেন। তিনি কেবল নিজের জন্য লেখেননি তিনি লিখেছেন নিপীড়িত মানুষের জন্য। তাঁর কলমে ছিল বিদ্রোহের আগুন। “বিদ্রোহী” কবিতায় তিনি যে উচ্চারণ করেছিলেন তা শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয় বরং পরাধীন জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তাঁর প্রতিটি শব্দ যেন ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান।
আবার এই বিদ্রোহী কবিই প্রেমের গান লিখে মানুষের হৃদয়কে গভীর আবেগে ভরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর ইসলামী গান শ্যামাসংগীত ভক্তিগীতি প্রেমের গান সবকিছুতেই ছিল এক অপূর্ব মাধুর্য। তিনি ধর্মকে কখনো বিভেদের দেয়াল হিসেবে দেখেননি। তাঁর চেতনায় ছিল সম্প্রীতির দীপ্ত আলো। তাই তাঁর রচনায় যেমন মসজিদের আজান ধ্বনিত হয়েছে তেমনি মন্দিরের শঙ্খধ্বনিও সমানভাবে উচ্চারিত হয়েছে।
নজরুলের জীবনও ছিল সংগ্রামের। দারিদ্র্য অবহেলা কারাবরণ অসুস্থতা সবকিছুর মধ্য দিয়েও তিনি মানুষের মুক্তির গান গেয়ে গেছেন। তাঁর সাহস ছিল অসাধারণ। তিনি সত্যকে সত্য বলার শক্তি রাখতেন। ক্ষমতার কাছে মাথানত না করার শিক্ষা তিনি তাঁর সাহিত্য ও জীবন দিয়ে আমাদের দিয়ে গেছেন।
আজকের সমাজেও নজরুল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পৃথিবী আজ বিভাজন হিংসা অসহিষ্ণুতা আর মানবিক সংকটে আক্রান্ত। এমন সময়ে নজরুল আমাদের শেখান কিভাবে মানুষকে ভালোবাসতে হয় আবার প্রয়োজন হলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেও হয়। শুধু কোমলতা দিয়ে জীবন চলে না আবার শুধু কঠোরতাও পৃথিবীকে সুন্দর করতে পারে না। তাই মানুষের হৃদয়ে যেমন বাঁশরির সুর থাকা প্রয়োজন তেমনি রণতূর্যের সাহসও থাকা প্রয়োজন।
আমার কাছে তাই “মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি আর হাতে রণতূর্য” শুধু একটি কবিতার পঙক্তি নয় এটি একটি জীবনবোধ। এই পঙক্তির ভেতরে আমি খুঁজে পাই প্রেম ও প্রতিবাদের অপূর্ব সমন্বয়। খুঁজে পাই মানুষের জন্য বেঁচে থাকার প্রেরণা।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর জন্মদিনে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা। তাঁর সৃষ্টি আমাদের হৃদয়ে মানবতার আলো জ্বালিয়ে রাখুক। নতুন প্রজন্ম তাঁর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সত্য ন্যায় ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ হোক। বিদ্রোহী কবির জন্মদিন হোক আমাদের আত্মজাগরণের দিন।
শুভ জন্মদিন প্রিয়…..


