আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে মিয়ানমারের নারীদের চীনে পাচার করে তথাকথিত ‘বউ’ হিসেবে বিক্রি করার মানবপাচার চক্র উদ্বেগজনকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। জান্তা সরকারের প্রকাশিত তথ্য ও বিভিন্ন তদন্তে এই অপরাধচক্রের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। খবর দ্য ইরাবতি।
জান্তা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে মিয়ানমারে মানবপাচারের ৮০টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১৪টি ঘটনায় ভুয়া বিয়ের ফাঁদে ফেলে নারীদের বিদেশে, বিশেষ করে চীনে পাচার করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মান্দালয়ের ২০ বছর বয়সী এক তরুণীকে চীনা এক ব্যক্তির সন্তান জন্ম দিলে ১ কোটি ৫০ লাখ কিয়াত দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। একইভাবে ইয়াঙ্গুনের একটি পোশাক কারখানার ২৮ বছর বয়সী এক নারীকে ছয় মাসের জন্য এক চীনা নাগরিককে বিয়ে করতে রাজি হলে ৮০ লাখ কিয়াত দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
আরেক ঘটনায়, নেপিডোর ২৪ বছর বয়সী এক নারীকে বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে চীনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে একাধিকবার বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়। পরে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে চীনা পুলিশ তাকে নয় মাস আটক রাখে।
এছাড়া স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ২ কোটি কিয়াত দেনমোহরের বিনিময়ে ইয়াঙ্গুনের এক নারীর সঙ্গে এক চীনা নাগরিকের বিয়ের আয়োজনের তথ্যও পাওয়া গেছে। আরও দুটি ঘটনায় তিন নারীকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রত্যেককে ১ কোটি ৫০ লাখ কিয়াত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এ মানবপাচার এখন শুধু মিয়ানমার-চীন সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রে রূপ নিয়েছে।
গত মার্চে তাইওয়ানের নিউ তাইপেই শহরে অভিযানে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার এবং মিয়ানমারের নয় নারীকে উদ্ধার করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। তদন্তে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্চ বেতনের চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে নারীদের ফাঁদে ফেলে ঋণের জালে আটকে জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন শোষণের শিকার করা হতো। স্থানীয় গণমাধ্যম এই চক্রকে ‘কেকে পার্কের তাইওয়ান সংস্করণ’ বলে উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে, গত মাসে ব্যাংককে এক চীনা মানবপাচার চক্রের মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করে থাই পুলিশ। তদন্তে জানা যায়, ২০২৪ সাল থেকে চক্রটি অন্তত ২০ জন মিয়ানমারের নারীকে চীনে পাচার করেছে। একই সময়ে অন্তত ২০ জন চীনা নাগরিককে ইয়াঙ্গুনে এনে অবৈধভাবে পাত্রী খুঁজে দেওয়ার কাজেও সহায়তা করেছে।
চীনা দূতাবাসও চলতি বছরের জানুয়ারিতে নিজেদের নাগরিকদের সীমান্ত পেরিয়ে পাত্রী খোঁজার বিষয়ে সতর্ক করে জানায়, এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে ক্রমেই বেশি সংখ্যক চীনা নাগরিক আইনের আওতায় আসছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, গৃহযুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি এবং আইনের শাসনের অবনতির কারণে বহু নারী মানবপাচারকারীদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র এখন আরও সক্রিয়ভাবে নারীদের টার্গেট করছে, ফলে মানবপাচারের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।


