বরেদ্রকণ্ঠ নিউজ
সাক্ষরতার গুরুত্ব ও শিক্ষার সুযোগ সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে আজ মঙ্গলবার দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে।
এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’। ইউনেস্কোর নির্ধারিত এই প্রতিপাদ্যে সাক্ষরতাকে শুধু পড়া, লেখা কিংবা সাধারণ হিসাব-নিকাশের সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যক্তি, সমাজ ও পরিবেশের টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে সাক্ষরতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাক্ষরতার হার এখন ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার বাইরে রয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, বর্তমানে শুধু অক্ষরজ্ঞান দেওয়াই যথেষ্ট নয়। বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা ও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষকে প্রয়োগিক সাক্ষরতা, ডিজিটাল দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষার আওতায় আনা জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্বে সাক্ষরতার ধারণাও বদলে যাচ্ছে। দৈনন্দিন জীবনে তথ্য ব্যবহার, প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং জীবিকা অর্জনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা—সবকিছুই এখন কার্যকর সাক্ষরতার অংশ। ফলে প্রাথমিক অক্ষরজ্ঞান থেকে মানুষের জীবন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত দক্ষতা অর্জনের দিকে গুরুত্ব বাড়ছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদেও সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা এবং নিরক্ষরতা দূর করার অঙ্গীকার রয়েছে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি উপানুষ্ঠানিক ও বয়স্ক শিক্ষা, জীবনদক্ষতা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
দিবসটি উপলক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মিলনায়তনে সকালে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা ও ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্মাননা প্রদান’ অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব জেসমিন নাহারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক মনোয়ারা ইশরাত। আলোচনা শেষে থাকবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
কেন্দ্রীয় আয়োজনের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসকের সমন্বয়ে আলোচনা সভা ও বিশেষ কর্মসূচি পালিত হবে। উপজেলা পর্যায়েও র্যালি, আলোচনা সভা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন এনজিও নিজস্ব কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করবে।
বিশ্বজুড়ে সাক্ষরতার গুরুত্ব তুলে ধরতে ১৯৬৭ সালে ইউনেস্কো ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে দিনটি নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি এবং শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির ধারাবাহিক সাফল্যের পর এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই অর্জনকে কার্যকর শিক্ষা ও দক্ষতায় রূপান্তর করা। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যও সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনছে—সাক্ষরতা যেন ব্যক্তির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সমাজ, পরিবেশ ও অর্থনীতির টেকসই সমৃদ্ধির ভিত্তি হয়ে ওঠে।


