ডেস্ক রিপোর্ট
নওগাঁর নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে নিয়ামতপুর থানায় এ হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত গৃহবধূ পপি সুলতানার বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে আজ বুধবার সকালে নিয়ামতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান জানান, নিহত গৃহবধূ পপি সুলতানার বাবা বাদী হয়ে গতকাল রাতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানা হেফাজনে নেওয়া হয়। থানা হেফাজতে নেওয়া ব্যক্তিরা হলেন, নিহত হাবিবুরের বাবা নমির উদ্দিন, বোন ডালিমা বেগম ও হালিমা খাতুন ও ভাগনে সবুজ রানা।
ওসি মাহবুবুর রহমান বলেন, তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানা হেফাজতে নেওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদ এখনও চলছে। হত্যার রহস্য অনেকটাই উন্মোচিত। আসামিদের গ্রেপ্তারে তৎপর রয়েছে পুলিশ। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ, সিআইডি টিমসহ পুলিশের একাধিক সংস্থা কাজ করছে।
ওসি আরও বলেন, মরদেহগুলো এখনও নওগাঁ সদর হাসপাতাল মর্গে রয়েছে। আজ বুধবার দুপুরের দিকে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
গত সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে এক দম্পত্তি ও তাঁদের দুই শিশু সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহতরা হলেন, বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩৫), তাঁর স্ত্রী পপি সুলতানা, তাঁদের সন্তান পারভেজ রহমান (৯) ও সাদিয়া আক্তার (৩)।
হত্যার পেছনে জমি নিয়ে বিরোধের কথা সামনে আনছেন স্বজনরা:
দুই শিশুসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার পেছনে জমি নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধের কথা সামনে আনছে স্বজনরা। তবে পুলিশ এখনই কোনো সিদ্ধান্তে আসছে না। নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এই হত্যাকা- ডাকাতি বলে মনে হচ্ছে না। পূর্ব শত্রুতার জেরে এই হত্যাকা- ঘটে থাকতে পারে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে আমরা এখনই কোনো সিদ্ধান্তে আসতে চাইছি না। আশা করছি, খুব শিঘ্রই এই হত্যার রহস্য উন্মোচন হবে এবং আসামিরা গ্রেপ্তার হবে।’
নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দা সূত্রে জানা যায়, স্থানীয়রা জানান, নমির উদ্দিনের পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে। সম্প্রতি তিনি একমাত্র ছেলে হাবিবুর রহমানকে বসতভিটাসহ ১০ বিঘা জমি লিখে দেন। অন্যদিকে পাঁচ মেয়েকে দেন ১০ কাঠা করে জমি। এই জমি বন্টনকে কেন্দ্র করে ভাই-বোনদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। তাঁদের মধ্যে এই বিরোধ নিয়ে থানায় মামলা হয়েছে। গ্রামে সলিস বৈঠকও হয়েছে।
মামলার বাদী ও নিহত গৃহবধূ পপি সুলতানার বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমার জামাইকে বাড়ি ভিটা মিলে ১০ বিঘা জমি লিখে দেয় তাঁর বাবা। আমার জামাই তাঁর বাবার একমাত্র ছেলে। আমার জামাইকে ১০ বিঘা জমি দেওয়াতেই মূল সমস্যা। এইটা নিয়েই তাঁর বোন-ভায়রাদের হিংসা শুরু হয়। তখন থেকেই তাঁরা হাবিবুর ও আমার মেয়ের বংশকে নির্বংশ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। জমি নিয়ে বিবাদের জেরে গ্রামে সালিস বসেছিল। সেখানে হাবিবুরের বড় বোন ডালিমার স্বামী ও তাঁর ছেলে আমার জামাই-মেয়েকে হত্যার হুমকি দেয়।’
নিহত পপির মামা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘কিছুদিন আগে জমি নিয়ে বোনেদের সঙ্গে হাবিবুরের দ্বন্দ্ব হয়। এ নিয়ে কয়েকদিন সালিশ হলেও ঘটনার সমাধান হয়নি। বার বার বলার পরও তার বাবা (নমির) এ সমস্যার সমাধান করেননি। শেষে জমিই একটা পরিবারকে ধ্বংস করে দিলো।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘কয়েকদিন আগে ‘নুডুলসে বিষ মিশিয়ে’ ছেলে মেয়েসহ তার ভাগ্নিকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার পর তাঁরা সুস্থ হয়।’
গতকাল মঙ্গলবার বাহাদুরপুর গ্রামে ঘটনাস্থলে কথা হয় নিহত পপি সুলতানার মা সাবিনা বেগমের সঙ্গে। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাকে ন্যায্য বিচার করে দেন। ন্যায্য বিচার, আমি কোনো কিছু চাই না, ওর বাপ শুধু একটা অঘটন ঘটালো আর চারটা কেন খুন করলো? ওর বাপ তো বেঁচে আছে, ওই কেন বেঁচে থাকলো? খুন করলে পাঁচজনাকেই খুন করবে।’


