বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, মাদক নিয়ন্ত্রণ ও চুরি-ডাকাতি প্রতিরোধে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন বদলগাছী থানার নবাগত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান। তবে এ মতবিনিময় সভাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও বিতর্ক। উঠেছে বৈষম্য, বর্জন, সাংগঠনিক পরিচয় এবং সাংবাদিকতার পেশাদারত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন।
গত ১৪ অক্টোবর দুপুর ১২টায় বদলগাছী থানার ওসির কার্যালয়ে বদলগাছী প্রেসক্লাবের আয়োজনে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রেসক্লাবের সভাপতি সানজাদ রয়েল সাগর, সাধারণ সম্পাদক আবু জর গিফারীসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় ওসি হাবিবুর রহমান বলেন, পুলিশের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ দমন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে পুলিশ ও সাংবাদিকদের পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এ সময় সাংবাদিকেরা উপজেলার বিভিন্ন সমস্যা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভাকে কেন্দ্র করে বদলগাছী উপজেলা প্রেসক্লাব ও বদলগাছী সাংবাদিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলা হয়েছে। তাদের দাবি, সভা আয়োজনের ক্ষেত্রে সব সাংবাদিককে সমানভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি। পরদিন ১৫ অক্টোবর অন্য সাংবাদিকদের নিয়ে পৃথক মতবিনিময়ের আয়োজন করায় সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন তৈরির আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তাঁরা।অভিযোগের প্রতিবাদে সংগঠন দুটির সাংবাদিকেরা সভা বর্জন করেছেন বলে তাঁদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
অন্যদিকে, বদলগাছী প্রেসক্লাবের সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকেরা বলছেন, ১৪ অক্টোবরের সভায় উপস্থিত সাংবাদিকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, সভা বর্জনের নামে মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীদের সম্পৃক্ত করে যেসব বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে, তা বিভ্রান্তিকর। সভার ছবি ও উপস্থিতির তথ্যও তাঁদের অংশগ্রহণের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন তাঁরা।
বদলগাছী প্রেসক্লাবের বক্তব্য পরিষ্কার—সংবাদ হোক তথ্যের ভিত্তিতে, প্রতিবাদ হোক যুক্তিতে, আর সাংবাদিকতার পরিচয় ফুটে উঠুক পেশাদারত্বে।সাংবাদিক পরিচয় কোনো ঢাল নয়, কোনো বিশেষ সুবিধার লাইসেন্সও নয়। পেশার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে কাজেই তার পরিচয় দিতে হয়; শুধু নামের আগে ‘সাংবাদিক’ লিখলেই দায়িত্বশীল সাংবাদিক হওয়া যায় না।
বদলগাছীতে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা ও নেতৃত্ব নিয়েও আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বদলগাছী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের জেলা প্রতিনিধি পরিচয়কে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।
বদলগাছী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আশরাফুল ইসলাম নয়নকে ঘিরেও সাংগঠনিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আগে নওগাঁ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং নির্বাচনে পরাজয়ের পর স্থানীয় পর্যায়ে নতুন সংগঠন গড়ে তোলেন। সংগঠনটির নেতৃত্ব ও সদস্যদের একাংশ জেলা পর্যায়ে কাজ করেন বলেও সমালোচকদের দাবি।
এদিকে, বদলগাছী প্রেসক্লাবের কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, বদলগাছী উপজেলা প্রেসক্লাবের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ঘটনায় অভিযোগ ও মামলা রয়েছে।
তাঁদের দাবি, এসব ঘটনা সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, আবাদপুর-সাতগাছি এলাকায় মাছ ধরার জেলেদের কাছ থেকে টাকা ও মাছ নেওয়ার একটি ঘটনার সঙ্গে বদলগাছী উপজেলা প্রেসক্লাবের এক সদস্যের নাম জড়িয়েছিল। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়ভাবে মীমাংসা হয়।
এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছ থেকে ব্যাংকে ঋণ পাইয়ে দেওয়া এবং ঘরবাড়ি নির্মাণে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জনের কাছ থেকে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা নেওয়ার পর ওই ব্যক্তি আত্মগোপনে চলে গেছে।
এই প্রতরক ছয় মাস ধরে নিজেকে “সাংবাদিক” পরিচয় দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবাধে ঘুরে বেড়িয়েছে। অশিক্ষিত হলেও প্রতারণার কৌশলে ছিলো অত্যন্ত ধূর্ত। কখনো ব্যাংক থেকে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার কথা, কখনো ঘরবাড়ি নির্মাণের আশ্বাস,এভাবেই অসহায় ও সহজ-সরল মানুষের স্বপ্ন নিয়ে খেলেছে সে।
প্রশ্ন হলো যারা তাকে পাশে নিয়ে ঘুরেছেন, সাংবাদিক পরিচয়ে মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন, তারা কি এখন দায় এড়াতে পারবেন? এই অসহায় মানুষগুলোর কান্নার দায় কি শুধু প্রতারকের, নাকি তাকে “ছত্রছায়া” দেওয়া মানুষগুলোরও?
এছাড়ও সদ্য নওগাঁয় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে বদলগাছী উপজেলা প্রেসক্লাবের সারোয়ার হোসেন অপু (৩২) গ্রেপ্তার হয়েছে।এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বক্তব্যে আরও কয়েকজনের নাম এসেছে বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে বদলগাছী উপজেলা প্রেসক্লাবের লিটন হোসেনের নাম আছে ও উজ্জল হোসেন নামে সাংবাদিক পরিচয় দানকারী এক জনের নামও রয়েছে বলে অভিযোগ।
বদলগাছী প্রেসক্লাবের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, পেশাগত পরিচয়, কাজের স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতাই তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিক পরিচয় কোনো বিশেষ সুবিধার লাইসেন্স নয়। পদবি নয়, পেশাগত কাজই হোক পরিচয়ের ভিত্তি। সংবাদ হোক তথ্যনির্ভর, প্রতিবাদ হোক যুক্তিনির্ভর, আর অভিযোগের নিষ্পত্তি হোক প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ায়।


