আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে রাশিয়া। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় শুরু হওয়া জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে দেশটির অবস্থানে পরিবর্তনের কোনো আভাস পাওয়া যায়নি। বরং ইউক্রেন ও ইরানকে কেন্দ্র করে বৈঠকে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে লাভরভ বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য উপস্থাপন করেছেন।
বৈঠকের বিরতিতে এএফপিকে কালাস বলেন, লাভরভের বক্তব্যের জবাব দিতে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা প্রস্তুত ছিলেন। অন্যদিকে, ইউরোপের এক কূটনৈতিক সূত্র রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে উসকানিমূলক বলে বর্ণনা করেছে।
লাভরভ তার বক্তব্যে ইউরোপীয় দেশগুলোর বর্জননীতির সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেন।
বৈঠকে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের আরেকটি নজির দেখা যায় আনুষ্ঠানিক গ্রুপ ছবি তোলার আয়োজন বাতিলের মধ্য দিয়ে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে এএফপি জানিয়েছে, লাভরভের সঙ্গে একই ছবিতে থাকতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন ইউরোপের কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি। পরে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ছবি তোলার বিষয়টি যেন মূল আলোচনার গুরুত্ব কমিয়ে না দেয়, সে কারণেই আনুষ্ঠানিক আয়োজনটি বাতিল করা হয়েছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর চার বছরের বেশি সময় পার হলেও সংঘাতের অবসান হয়নি। এ সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈঠকেও রুশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ছবি তোলা এড়িয়ে গেছেন ইউরোপীয় নেতারা।
রুবিও-লাভরভ বৈঠকে আলোচনার ইঙ্গিত
জি-২০ সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি সদস্যদেশগুলোকে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার আহ্বান জানান।
বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার চাপ এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বৈঠকের একপর্যায়ে রুবিওর সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন লাভরভ। পরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ আলোচনাকে সন্তোষজনক বলে অভিহিত করেন।
তবে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না ইউরোপের প্রতিনিধিরা। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে এখন আর কোনো কিছুই স্বাভাবিক নেই। কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ইউক্রেনের প্রস্তাব গ্রহণের জন্য মস্কোর প্রতি আবারও আহ্বান জানানো হবে বলেও জানান তিনি।
ইরান সংকট ও জ্বালানি বাজারেও বাড়তি উদ্বেগ
এবারের জি-২০ বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে। ফলে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
আটলান্টার বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য ঘাটতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে চায়। তবে ইউক্রেন ও ইরান ইস্যুতে মতপার্থক্যের কারণে বড় ধরনের সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুই দিনের বৈঠক শেষে শনিবার চূড়ান্ত যৌথ ঘোষণা প্রকাশের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সভাপতিমণ্ডলীর একটি সারসংক্ষেপ প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগে ওয়াশিংটনের কৌশল
ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার পাশাপাশি জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে ওয়াশিংটন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নভেম্বর মাসে মস্কো, কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে ডিসেম্বর মাসে ফ্লোরিডার মায়ামিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডোরাল রিসোর্টে অনুষ্ঠিতব্য জি-২০ নেতাদের সম্মেলন ঘিরেও প্রস্তুতি চলছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ওই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং মস্কোর ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা গুরুত্ব পাচ্ছে
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে কোনো ধরনের হুমকি বা অতিরিক্ত টোল ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখার বিষয়ে দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের সুরক্ষা—এই চারটি বিষয় এবারের জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।


