বরেন্দ্রকণ্ঠ নিউজঃ
দেশের কারাগারগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে কারা অধিদপ্তর। এ লক্ষ্যে সাত দফা নির্দেশনার বাস্তবায়ন তদারকিতে সারাদেশের কারাগারে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলা, অননুমোদিত অনুপস্থিতি ও নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় কারাগারে লকআপ-পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, সার্বক্ষণিক সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কারারক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ থাকা কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী বদলির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কারাগারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের শৈথিল্য যেন তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যেই এসব নির্দেশনা কার্যকর করা হচ্ছে। বিশেষ করে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, নিয়ম অমান্য এবং তদারকির দুর্বলতা থেকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল মেসবাহুল আলম সেলিম জানান, সাত দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দেশের প্রতিটি কারাগারে প্রতিদিন তদারকি কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত প্রতিবেদন ও মতামত জমা দিতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে অধিদপ্তরের অপারেশনাল শাখাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডেপুটি জেলারসহ অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন কারাগারের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দাবি, ইতোমধ্যে নির্দেশনার অন্তত ৯০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এসব উদ্যোগের সুফল দৃশ্যমান হবে বলে আশা করছে অধিদপ্তর। দায়িত্ব পালনে অবহেলার দায়ে অভিযুক্ত কর্মীদের আন্তঃকারাগারে বদলির নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো লকআপের পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ। জরুরি ও অনুমোদিত প্রয়োজন ছাড়া এ সময় কোনো ব্যতিক্রমী কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে লকআপ-পরবর্তী কোনো ব্যবস্থা নিতে হলে জেলারের লিখিত অনুমোদন, নির্ধারিত সময়সীমা এবং সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারে বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিটি কারাগারে ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেখানে সম্ভব, সেখানে পৃথক পর্যবেক্ষণ কক্ষ স্থাপন এবং প্রশিক্ষিত ও প্রযুক্তিতে দক্ষ কারারক্ষীদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পর্যবেক্ষণ কক্ষের ব্যবস্থা না থাকলে উপযুক্ত স্থানে মনিটর স্থাপন করে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালু রাখতে হবে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কারারক্ষী ও পাহারাদারদের নির্ধারিত কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতেও কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে অধিদপ্তর। অনুমতি ছাড়া দায়িত্বের স্থান ত্যাগ করলে তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত প্রতিবেদন দিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীর বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
শুধু দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মীই নন, তাদের তদারকিতে নিয়োজিত কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে। কোনো অনিয়ম বা অননুমোদিত অনুপস্থিতির ঘটনা গোপন করা, প্রতিবেদন দিতে বিলম্ব করা কিংবা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তাদেরও জবাব দিতে হবে।
নির্দেশনায় দায়িত্ব পালনে বারবার অবহেলার অভিযোগ পাওয়া কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং ও উৎসাহমূলক কার্যক্রমের কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে প্রশাসনিক স্বার্থে তাদের অন্য কারাগারে বদলি করা হবে। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রচলিত বিধিমালার আওতায় বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বৃষ্টি ও বজ্রপাতের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রহরীদের নির্ধারিত অবস্থানে থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময় নিরাপত্তা কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘ্ন যাতে না ঘটে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে কারাগারের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি যাচাইয়ে সুপারিনটেনডেন্ট, জেলার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি আকস্মিক পরিদর্শন পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব পরিদর্শনে নিরাপত্তা চৌকি, সিসিটিভি ব্যবস্থা, প্রহরীদের দায়িত্ব পালন এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম পরীক্ষা করা হবে। কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
উল্লেখ্য, গত আগস্টে জারি করা সাত দফা নির্দেশনায় কারাগারের অভ্যন্তরে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্ভাব্য প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় নিরাপত্তা ঘাটতি দূর করা এবং কারা প্রশাসনের প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বশীলতা বাড়াতে নতুন করে তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়ন হলে কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নির্দেশনাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিয়মিত তদারকি, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর।


