নাজমুল হক, সিরাজগঞ্জ থেকে ফিরে:
এক সময় ফুলজোর ছিল প্রানের মতো-চলমান, চঞ্চলা, জীবনমুখর। বগুড়ার ধুনট উপজেলার যুগগাতি বিল থেকে জন্ম নিয়ে সে ছুটে এসেছিল সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, কামারখন্দ, উললাপাড়া, শাহজাদপুরের জনপদ ছুঁয়ে শেষে হুরাসাগরের বুকে বিলীন হয়ে । নদীর ৫৫ কিলোমিটার এই দীর্ঘ যাত্রাপথে জড়িয়ে ছিল মানুষের হাসি-কান্না, ঘাম আর স্বপ্ন ।
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে জেলেদের নৌকা ভাসতো ফুলজোরে। জালের সঙ্গে উঠতো জীবনের আশা। নদীর পানিতে সেচ দিয়ে সবুজ হতো মাঠ; দোল খেত ধানের শীষ। বর্ষায় ফুলজোর হয়ে উঠতো উজ্জল, আর শীতে শান্ত- তবু কখনও ফুরিয়ে যেত না তার প্রান।
কিন্তু সময় বদলেছে, বদলে গেছে ফুলজোরও। আজ আর সেই চঞ্চল নদী নেই, নাব্যতা হারিয়ে ফুলজোর এখন ক্লান্ত । পলি জমে সঙ্কুচিত হয়েছে তার বুক, আর তার ওপর কচুরিপানার চাদর। দূর থেকে তাকালে মনে হয়- এ যেন নদী নয়, স্থির কোন জলাভূমি। অথচ এই স্ববিরতার নিচেই চাপা পড়ে আছে এক সময়ের স্রোতস্বিনী ফুলজোর ।
কচুরিপানার দখলে পড়ে নদীর জল আর বয়ে যেতে পারে না। দম বন্ধ হয়ে আসে তার প্রবাহ । মাছ হারিয়ে যাচ্ছে, হারাচ্ছে জেলেদের জীবিকা ।
নদীর দুর্দশার প্রভাব পড়েছে কৃষি আবাদেও। মাঠ শুকিয়ে যাচ্ছে, ফসলের স্বপ্ন শুকিয়ে যাচ্ছে । শুষ্ক মৌসুমে নদীর শূন্য বুকে দেখা যায় খরার ছায়া । প্রকৃতি যেন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে।
স্থানীয় মানুষের কন্ঠে ক্ষোভ আর বেদনা মিলেমিশে একাকার । তারা বলেন, ফুলজোর আজ এক অবহেলার প্রতীক । কাগজে- কলমে নদী থাকলেও বাস্তবে তার অস্থিত্ত্ব প্রশ্নের মুখে ।
ফুলজোর শুধু জলাধার নয়, সে এই অঞ্চলের স্মৃতি, সংস্কৃতি আর জীবনের অংশ । এই নদী শুকিয়ে গেলে, শুকিয়ে যাবে এক জনপদের ইতিহাস । তাই ফুলজোরের নি:শব্দ দীর্ঘশ্বাস শোনার সময় এখনই। দেরি হলে, একদিন হয়তো নদীর জায়গায় শুধু নামটুকুই থেকে যাবে- ফুলজোর এক হারিয়ে যাওয়া গল্পের মতো।


