রম্য লেখক, হক আমিন
বর্ষার জল যখন গ্রামবাংলার বুকজুড়ে নেমে আসে, তখন নদী, নালা, খাল, বিল, পুকুর, জলাশয় যেন নতুন করে জীবন পায়। জলে জেগে ওঠে সবুজের ভেলা–কচুরিপানা। এ যেন প্রকৃতির নিজ হাতে সাজানো বাগান । সেই বাগানে একদিন জন্ম নেয় লাজুক রঙের চমক–কচুরিপানা ফুল। এটি যেন জলের ওপর ভাসমান এক নীলাভ স্বপ্ন, যা নীরবে ফুটে ওঠে আর নীরবেই ঝরে যায় ।
কচুরিপানা ফুল দেখতে যেন একটু শাপলার মতো, আবার একটু বুনো ফুলের মতোও । তবে এর রঙ– সেই হালকা বেগুনি, যার ওপর আকাশি ছাপ আর মাঝখানে সূর্যের মতো একটি হলুদ বিন্দু– এটি তাকে অন্যসব ফুল থেকে আলাদা করে দেয় । পুকুরের অচেনা কোনে কিংবা বিলে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের চোখে পড়ে তার চুপিচুপি ফুটে ওঠা।
রোদে তার রঙ গভীর, গোধূলিতে মায়াময় আর সকাল বেলার কুয়াশায় সে যেন ধীরে ধীরে জলে নামা কোন অপরূপ পরীর ছায়া ।
কচুরিপানা ফুল খুব কম মানুষই ঘরে তোলে। এই ফুলের কোন বাজার নেই, নেই কোন বাণিজ্যিক কদর।
তবুও গ্রাম গঞ্জের মানুষের কাছে এটি যেন এক অঘোষিত আনন্দ । যে ফুল কখনও কারও গলায় মালা হয়ে ওঠে না, সেই ফুলই কত মানুষের মন ছুঁয়ে যায়–এটাই কচুরিপানা ফুলের বিস্ময় ।
কচুরিপানা নিয়ে অনক অভিযোগ — এটি নৌকা চলাচলে বাঁধা তৈরি করে, মাছ ধরার অসুবিধা করে, খালের পানি প্রবাহ আটকে দেয়, কখনও মশা মাছির জন্মস্থান হয়ে ওঠে ।
কিন্তু যদি একটু থামা যায়, তাকানো যায়, তবে দেখা যায় কচুরিপানা ফুল সেই সব অভিযোগের ধার ধারে না। সে ফুটে শুধু নিজের জন্য নয়, প্রকৃতির রূপের জন্য ।
কচুরিপানা ফুল যেন বলে– সৌন্দর্য সবসময় বড় আর চোখে পড়ার মতো হয় না। কখনও তা জলের ওপর ভাসে নীরবে, অবহেলার মাঝেও।
একটি সাধারণ, প্রায় অবাঞ্ছিত জলজ উদ্ভিদের ফুল হয়েও তার সৌন্দর্য এত শুদ্ধ, এত মৃদু মায়াময় যে, মন ঠিকই টেনে নেয় । প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক মূলত এই অনুভূতির মধ্যেই– যেখানে ছোট একটি ফুলও হৃদয়ের কোনে কোনে স্ফুলিঙ্গ ছড়ায় ।


