নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুষ্টিয়া জেলার একটি ছোট্টগ্রাম—আনজনগাছি। কয়েক দশক আগেও এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবন আবর্তিত হতো কৃষি, মৌলিক জীবিকা আর সীমিত শিক্ষার সুযোগকে ঘিরে। সেই গ্রামেরই একজন শিক্ষার্থী আজ যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের জটিল সমস্যার সমাধান নিয়ে গবেষণা করছেন।
গল্পটি নুরুল ইসলামের। গ্রামের সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই তরুণ গবেষকের পথচলা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি অধ্যবসায়, শিক্ষার প্রতি অদম্যবিশ্বাস এবং বৈশ্বিক গবেষণার অঙ্গনে বাংলাদেশের সম্ভাবনার ও একটি প্রতিচ্ছবি।
ছোট গ্রামের বড় স্বপ্ন নুরুল ইসলামের জন্ম কুষ্টিয়া জেলার আনজনগাছি গ্রামে।সে সময় এলাকাটিতে শিক্ষার হার ছিল তুলনামূলকভাবে কম।উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আধুনিক গবেষণাগার কিংবা আন্তর্জাতিকমানের শিক্ষার সুযোগ—কোনোটিই ছিল না তাঁর নাগালের মধ্যে।
স্থানীয় বিদ্যালয় ও কলেজেই তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু।
শৈশব থেকেই গণিতের প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর।সেই আগ্রহই তাঁকে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।পরে তিনি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক এবং প্রথমস্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর শিক্ষাজীবন প্রমাণ করে, একটি প্রতিষ্ঠানের খ্যাতির চেয়ে শিক্ষার্থীর অধ্যবসায়ই অনেক সময় ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
শিক্ষকতা থেকে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা উচ্চ শিক্ষা শেষ করে নুরুল ইসলাম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।প্রায় দুই বছর শিক্ষার্থীদের গণিত পড়িয়েছেন তিনি। তবে শিক্ষকতা করতে গিয়েই তাঁর মনে একটি নতুন উপলব্ধি তৈরি হয়।
গণিত শুধু শ্রেণিকক্ষের বিষয় নয়; বাস্তবজীবনের জটিল সমস্যার সমাধানেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।এই উপলব্ধি থেকেই তিনি ২০১৯ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট অপারেশনস বিভাগে একটি কারিগরি পদে যোগ দেন।
বিমান পরিচালনার মতো অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্ম পরিবেশ তাঁকে বাস্তব সমস্যার বিশ্লেষণ, তথ্য নির্ভর সিদ্ধান্ত এবং গাণিতিক চিন্তার প্রয়োগ সম্পর্কে নতুন অভিজ্ঞতা দেয়।
স্বপ্নের পথে নতুন যাত্রা বাংলাদেশে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও নুরুল ইসলামের লক্ষ্য ছিল আরও দূরে।
দীর্ঘ দিনের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
সেখানে তিনি ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে দ্বিতীয় বারের মতোস্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে এইবিশ্ববিদ্যালয় কার্নেগি শ্রেণি বিন্যাস অনুযায়ী আর–ওয়ান (R1)গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে পিএইচডি গবেষণা করছেন।২০২৮ সালে তাঁর ডক্টরাল ডিগ্রি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
গবেষণার বিষয়: যেখানে গণিত ব্যাখ্যা করে জটিল পৃথিবীকে
নুরুল ইসলামের গবেষণার মূলক্ষেত্র ননলিনিয়ার ডাইনামিক্যাল সিস্টেম, ননলিনিয়ার তরঙ্গের বিস্তার, কেওসতত্ত্ব, বৈজ্ঞানিক কম্পিউটিং এবং ফরমাল ম্যাথমেটিক্যাল প্রুফভেরিফিকেশন।
প্রকৃতির অনেক ঘটনা সরল নিয়ম মেনে চলে না। সমুদ্রের ঢেউ, বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন, জটিল তরলের আচরণ কিংবা বিভিন্ন প্রকৌশলগত ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র পরিবর্তন ও কখনো বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। এসব জটিল আচরণ বোঝার জন্য গণিতের যে শাখা কাজ করে, তাঁর গবেষণা সেই ক্ষেত্রেই। আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশনা
নুরুল ইসলামের প্রথম গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এই বছরের জুন মাসে জার্নাল অব ননলিনিয়ার ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিক্স-এ।
গবেষণাটিতে পরিবর্তিত বেঞ্জামিন–বোনা–মাহোনি সমীকরণের ভিত্তিতে একটি ননলিনিয়ার Fluid Model বিশ্লেষণ করা হয়েছে।সেখানে বিভাজন (Bifurcation), সলিটন তরঙ্গ, কোয়াজি-পিরিয়ডিকগতি এবং বিশৃঙ্খল (Chaotic) আচরণ বিশ্লেষণে বিভিন্ন গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
এরপর তাঁর দ্বিতীয় গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্ববিখ্যাত নেচার পোর্টফোলিও এর Scientific Reports-এ প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়েছে।
এই গবেষণায় ননলিনিয়ার তরঙ্গের বিস্তার, গ্রানুলার পদার্থের আচরণ এবং জটিল গাণিতিক গতিবিদ্যা নিয়ে আরও বিস্তৃত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে।
গণিত, কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগ
নুরুল ইসলামের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফরমাল ম্যাথমেটিক্যাল থিওরেম প্রুভিং। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে তিনি এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যেখানে কম্পিউটার গাণিতিক উপপাদ্যের প্রমাণ ধাপে ধাপে যাচাই করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এধরনের প্রযুক্তি গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।জটিল গাণিতিক প্রমাণ নির্ভুল ভাবে যাচাই করার ক্ষেত্রে এধরনের পদ্ধতি গবেষকদের জন্য একটি কার্যকর সহায়ক প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী গুরুত্ব থাকতে পারে
বাংলাদেশের কয়েকজন গণিতবিদ ও গবেষকের মতে, ননলিনিয়ার তরঙ্গ ও গতিবিদ্যা নিয়ে এধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে উপকূলীয় পরিবেশ নিয়ে গবেষণায় অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূল, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে সমুদ্রের জটিল তরঙ্গের আচরণ, অস্থিতিশীলতা এবং পরিবর্তনের গাণিতিক বিশ্লেষণ ভবিষ্যতের বিভিন্ন গবেষণায় সহায়ক হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।
তবে গবেষকেরা ও মনে করিয়ে দেন, মৌলিক গণিতের গবেষণা থেকে বাস্তব প্রযুক্তি তৈরি হতে সময় লাগে।বিভিন্ন শাখার বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের যৌথ গবেষণার মাধ্যমেই এসব তাত্ত্বিক কাজ ভবিষ্যতে ব্যবহারিক প্রয়োগে রূপ নিতে পারে।
একটি যাত্রার অনুপ্রেরণা নুরুল ইসলামের গল্প কেবল একজন গবেষকের গল্প নয়। এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি সীমিত সুযোগ-সুবিধার একটি গ্রাম থেকে উঠে এসে ধাপে ধাপে নিজের শিক্ষাজীবন গড়ে তুলেছেন।
স্থানীয়বিদ্যালয় থেকে শুরু করে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সেখান থেকে শিক্ষকতা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে প্রযুক্তিগত দায়িত্ব পালন এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারে—প্রতিটি ধাপেই তিনি নতুন করে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন।
বাংলাদেশের অসংখ্য গ্রামের শিক্ষার্থীর জন্য তাঁর যাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—জন্মস্থান নয়, মানুষের অধ্যবসায়, কৌতূহল এবং শেখার আগ্রহই শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যতের পথ তৈরি করে।


