রাণীনগর (নওগাঁ) সংবাদদাতা
বাংলায় আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে পাতি ঘাস দিয়ে তৈরি শীতল পাটি বা ‘পাতির সপ’। প্রচণ্ড গরমে আরামদায়ক ও সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এই বিছানার কদর এক সময় আকাশচুম্বী থাকলেও বর্তমানে আধুনিক প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে তা হারিয়ে যেতে বসেছে। রঙ্গিন ও সস্তা প্লাস্টিক মাদুরের ভিড়ে চাহিদা কমে যাওয়ায় নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার পাতি চাষিরা এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন।
এত প্রতিকূলতার মাঝেও জীবন-জীবিকার তাগিদে এই প্রাচীন পেশাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন উপজেলার অনেক চাষি। তবে চাষিদের অভিযোগ, আধুনিক এই সময়ে পাতি চাষ টিকিয়ে রাখতে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কোনো ধরনের কারিগরি পরামর্শ বা সরকারি সহযোগিতা তারা পাচ্ছেন না।
কালিগ্রাম ইউনিয়নের করচগ্রামের প্রবীণ পাতি চাষি শ্রী গোকুল চন্দ্র দেবনাথ বলেন:
আমি প্রতি বছর ২-৩ বিঘা জমিতে পাতি চাষ করি। এটি উৎপাদন করেই আমার সংসার চলে। আমাদের গ্রামে আরও অনেকেই এই পেশায় যুক্ত। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, কৃষি অফিস থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সার-বিষ বা পরামর্শ পাইনি। সরকারি সহযোগিতা পেলে আমরা চাষ আরও বাড়িয়ে দিতাম।”
একই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন খট্টেশ্বর ইউনিয়নের বড়িয়া গ্রামের চাষি মোঃ মকবুল হোসেন। ২৪ কাঠা জমিতে পাতি চাষ করা এই কৃষক জানান, মাঠকর্মীরা পরিদর্শনে এসে নাম-ঠিকানা নিয়ে গেলেও পরে আর কোনো খোঁজ রাখেনি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পরিবেশবান্ধব এই কুটির শিল্পটি আজ হুমকির মুখে। এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে কেবল উৎসাহ নয়, বরং চাষিদের জন্য সরকারি প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রাণীনগরের এই ‘পাতির সপ’ আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে রাণীনগর উপজেলায় মোট ২৩ হেক্টর জমিতে পাতির চাষ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ধানের চেয়ে পাতি চাষ অনেক বেশি লাভজনক, বিশেষ করে নিচু জমি যেখানে ধানের আবাদ ভালো হয় না।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোস্তাকিমা খাতুন বলেন:স্বীকৃতির সংকট: পাতি চাষ এখনো ‘জিআই’ (Geographical Indication) স্বীকৃতি না পাওয়ায় চাষিদের সরাসরি বড় ধরনের আর্থিক সহযোগিতা বা সার-বীজ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ইতোমধ্যে এই শিল্প টিকে রাখতে জিআই স্বীকৃতির জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর লিখিত আবেদন করা হয়েছে। এই ঐতিহ্য যেন বিলুপ্ত না হয়, সে লক্ষ্যে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। কৃষকদের নিচু জমিতে পাতি চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এবার বড় ধরনের কোনো রোগ-বালাই না থাকায় চাষিরা ভালো লাভের মুখ দেখবেন বলে আশা করা হচ্ছে।


