জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে হঠাৎ আলুর দরপতনে বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। একদিকে হিমাগারে সংরক্ষণ খরচ, অন্যদিকে বাজারে আলুর অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি—সব মিলিয়ে পুরো উপজেলায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
এক হাজার মণ আলু উৎপাদন হলেও মৌসুমের শুরুতে প্রতিমণ ৪৭০ থেকে ৪৮০ টাকায় বিক্রি করে তিনি ৯০ হাজার টাকা ক্ষতির মুখে পড়েন। পরে দাম বাড়ার আশায় ২৫০ মণ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেন, কিন্তু হঠাৎ দরপতনে সেখানে আরও ২ লাখ টাকা লোকসান হয় তাঁর।
আলু কেনা থেকে হিমাগারে সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতি কেজিতে ২৩ টাকা খরচ পড়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতিকেজি ৮ থেকে সাড়ে ৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ফলে প্রতিকেজিতে ১৫ টাকা লোকসান হচ্ছে। তাঁর হিসাবে, এক হাজার বস্তা আলু হিমাগারে রেখে তিনি ৯ লাখ টাকার ক্ষতি গুনছেন।
বর্তমানে প্রতি মণ আলু বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায়। অথচ উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচসহ প্রতি মণে খরচ পড়েছে প্রায় ৯০০ টাকা। এতে মণপ্রতি ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা লোকসান হচ্ছে। উপজেলাজুড়ে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১০ থেকে ১৩ টাকা। বস্তা, পরিবহন, শ্রমিক মজুরি ও হিমাগার ভাড়া মিলে খরচ দাঁড়িয়েছে ২৩ টাকা প্রতি কেজিতে। কিন্তু বর্তমানে বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৮ টাকায়, ফলে প্রতিকেজিতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ১৫ টাকার লোকসানে রয়েছেন।
কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর উপজেলায় ৫ হাজার ৯২০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। এবার জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬০০ হেক্টর। উৎপাদন বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন, যা গত বছরের তুলনায় বেশি।
আক্কেলপুরের দীনা কোল্ড স্টোরেজ ও গোপীনাথপুর হিমাগারে এখনও আটকে আছে দুই লাখ ২৫ হাজার মণ আলু—যা মোট ধারণক্ষমতার অর্ধেক। হিমাগার কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রতি মণে ৬০০ টাকা লোকসান ধরলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
তারা জানিয়েছেন, ১৫ নভেম্বরের মধ্যে আলু তুলে নিতে মাইকিং করা হলেও কৃষকরা এখনো সাড়া দিচ্ছেন না।
গত ৫ সেপ্টেম্বর আকস্মিক সফরে আক্কেলপুরে আসেন সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি ঘোষণা দেন, সরকার টিসিবির মাধ্যমে ২২ টাকা কেজি দরে আলু কিনবে। তবে সেই প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
“বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেছিলেন, সরকার আলু কিনবে। সেটি হলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু একটি আলুও কেনা হয়নি। এখন বাজারে দাম কম, তাই হিমাগার থেকে আলু তুলি নাই।”
“আলুর দরপতনের প্রভাব হিমাগারেও পড়েছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আলু বের করছেন না। সংরক্ষণের সময় শেষ হয়ে আসছে। মাইকিং করেও তেমন সাড়া মিলছে না।”
“এ বছর উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহও বেশি। সরকারিভাবে ২২ টাকা দরে কেনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও এখনও নির্দেশনা আসেনি। আমরা রপ্তানি ও বিকল্প বাজার সৃষ্টির চেষ্টা করছি।”
নিরবচ্ছিন্ন লোকসান ও সরকারি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। তারা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে আলু আবাদে অনীহা দেখা দেবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।


