ঢাকার এক শীতল ডিসেম্বরের সকাল। বরিশালে জন্ম, কিন্তু বড় হওয়া ঢাকার আকাশ-বাতাসে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীতের প্রতি ঝোঁক ছিল প্রবল। স্কুলের গানের অনুষ্ঠানে প্রিয় ছিল নজরুলগীতি, আর সেই ভালোবাসা থেকেই ভর্তি হন চ্যায়ানৌতে—পাঁচ বছরের দীর্ঘ নজরুল সঙ্গীত প্রশিক্ষণ যেন তাঁর ভেতরের শিল্পী সত্তাকে গড়ে তুলছিল অজান্তেই।

কিন্তু কিশোর বয়সের স্বপ্ন শুধু গানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের জন্য কিছু করার তীব্র ইচ্ছা তাঁকে ১৯৮৩ সালে নিয়ে গেল এক ভিন্ন মঞ্চে—বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ১১ বিএমএ লং কোর্স শেষ করে ১৯৮৪ সালে কমিশন পেলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। তরুণ অফিসার হাসান মাসুদ তখন দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা আর দায়িত্ববোধের প্রতীক। আট বছরের সামরিক জীবনে পৌঁছে যান ক্যাপ্টেন পদে।

১৯৯২ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় অধ্যায়—সাংবাদিকতা। প্রথমে The New Nation-এ স্পোর্টস রিপোর্টার, পরে ১৯৯৫ সালে The Daily Star-এ যোগদান। মাঠের খেলার গল্প, মানুষের হাসি-কান্না, জীবনের নানা রঙ—সবই লিখে তুলতেন শব্দের জাদুতে। ২০০৪ সালে পা রাখলেন বিবিসি বাংলা বিশ্বসেবায়।
সাংবাদিকতার ব্যস্ততার মাঝে একদিন এল জীবনের তৃতীয় মোড়। পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তাঁকে ডাকলেন ‘ব্যাচেলর’ ছবির জন্য। শুরুতে খানিক দ্বিধা—সাংবাদিকতা ছেড়ে অভিনয়! কিন্তু চ্যালেঞ্জ নিতে তিনি অভ্যস্ত। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া সেই ছবিতেই দর্শক নতুন এক অভিনেতাকে খুঁজে পেল।
তারপরের গল্প সবার জানা—“Made in Bangladesh”, “৬৯”, “House Full”, “Taxi Driver” কিংবা “Batasher Ghor”—প্রতিটি কাজেই হাসান মাসুদ হয়ে উঠলেন দর্শকের আপনজন।
শুধু অভিনয় নয়, গানের মঞ্চও তাঁকে টানল। ‘ব্যাচেলর’-এর একটি গানে কণ্ঠ দেওয়ার পর ২০০৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ পেল তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম “Hridoy Ghotito”—যার প্রতিটি গান লিখেছেন মারজুক রাসেল, সুর দিয়েছেন প্রয়াত সঞ্জীব চৌধুরী, আর সংগীত সাজিয়েছেন বাপ্পা মজুমদার।
সেনাবাহিনীর কঠোর শৃঙ্খলা, সাংবাদিকতার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর অভিনয়ের নান্দনিকতা—এই তিন মিশ্রণে গড়ে উঠেছে হাসান মাসুদের অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর যাত্রা প্রমাণ করে- জীবনে পরিবর্তন মানে থেমে যাওয়া নয়, বরং নতুন পথে হাঁটার সাহস।
“জীবন একটা নদীর মতো। কখনো সোজা, কখনো বাঁক, কিন্তু থামা মানে শুকিয়ে যাওয়া”-এভাবেই নিজের গল্প বর্ণনা করেন হাসান মাসুদ।আজও নাটক, চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতে সমান সক্রিয় এই মানুষটি একাধারে অভিনেতা, গায়ক, সাংবাদিক ও প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা- যার প্রতিটি পরিচয়েই রয়েছে গর্বের ছাপ।


